ঘি এর "দানা" আসলে কি?
Jompesh Shopএকটা উদাহরণ দিয়ে বোঝালে আপনারা সহজেই বুঝতে পারবেন ঘি এর দানা আসলে কি।
আপনারা খেয়াল করে দেখবেন, সরিষার তেল কিন্তু শীতকালে জমে যায় না, কিন্তু নারিকেলের তেল কিন্তু শীতকালে সাদা আর শক্ত হয়ে যায়।
এর কারণ সরিষার তেলে আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি, যেগুলো সহজে জমে না। নারকেল তেলে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি, যেগুলো ঠান্ডায় জমে যায়।
ঘি-এর ভেতরে এই দুই ধরনের ফ্যাটই আছে। মোট ফ্যাটের ৬০ থেকে ৭৬ শতাংশই স্যাচুরেটেড। এই স্যাচুরেটেড দলে আবার কয়েক রকম আছে, পালমিটিক অ্যাসিড একটা তাপমাত্রায় জমে, স্টিয়ারিক অ্যাসিড আরেকটা তাপমাত্রায়। তাই ঘি ঠান্ডা হওয়ার সময় সবাই একসাথে জমে না, কেউ আগে জমে, কেউ পরে।
যেগুলো আগে জমে, সেগুলো জমার সময় ছোট ছোট কাঠামোয় সাজিয়ে নেয় নিজেদের। বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলে ক্রিস্টালাইজেশন। গরমে ফ্যাটের কণাগুলো এত দ্রুত ছোটাছুটি করে যে একে অপরের সাথে জুটতে পারে না। ঠান্ডায় সেই গতি কমে এলে কণাগুলো পরস্পরের কাছে আসতে পারে, সারিবদ্ধ হয়ে ছোট ছোট দানা তৈরি করে। বাকি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটগুলো তখনও তরল থাকে, সেই দানাগুলোর চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। এই দুটো মিলে যে টেক্সচার তৈরি হয়, সেটাই দানাদার ঘি।
এখন প্রশ্ন হলো, দানা তৈরি হওয়ার জন্য তাপমাত্রা ঠিক কত হওয়া দরকার?
ঘি-এর একটা নির্দিষ্ট melting point নেই, বরং একটা range আছে। গরুর ঘি এর ক্ষেত্রে সেটা সাধারণত ৩১ থেকে ৩৬ ডিগ্রির মধ্যে। এই তাপমাত্রার উপরে গেলে ঘি তরল হয়ে যায়, দানা থাকে না। তাপমাত্রা যখন ২৫ থেকে ৩১ ডিগ্রির মধ্যে নামে, তখন একটা মাঝামাঝি অবস্থা তৈরি হয়। সবচেয়ে বেশি গলনাঙ্কের ফ্যাটগুলো আংশিকভাবে জমতে শুরু করে, ঘি একটু ঘন বা ঘোলাটে দেখাতে পারে, কিন্তু স্পষ্ট দানা তখনও তৈরি হয় না। এটা ক্রিস্টালাইজেশনের শুরু।
সবচেয়ে সুন্দর, স্পষ্ট দানা তৈরি হয় ১৮ থেকে ২২ ডিগ্রির মধ্যে। এই তাপমাত্রায় উচ্চ ও মধ্যম গলনাঙ্কের ফ্যাটগুলো পুরোপুরি ক্রিস্টাল হয়ে দানা তৈরি করে, আর কম গলনাঙ্কের ফ্যাটগুলো তখনও তরল থেকে সেই দানাগুলোর চারপাশে থাকে। এই দুটোর সমন্বয়েই তৈরি হয় সেই পরিচিত দানাদার টেক্সচার।
শুধু তাপমাত্রা নয়, কত ধীরে ঠান্ডা হচ্ছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। ঘি যত ধীরে ঠান্ডা হবে, ফ্যাটের কণাগুলো তত সময় পাবে নিজেদের সুন্দরভাবে সাজাতে, ফলে দানা হয় স্পষ্ট এবং মাঝারি থেকে বড় আকারের। কিন্তু কারখানায় তৈরি ঘি দ্রুত ৬০ ডিগ্রি থেকে ২০ ডিগ্রিতে নামিয়ে আনা হয়, সাথে চলে জোরালো নাড়াচাড়া। এতে লক্ষ লক্ষ অতিসূক্ষ্ম ক্রিস্টাল একসাথে তৈরি হয়, ঘি দেখতে হয় মসৃণ আর ক্রিমি প্রক্রিয়াজাত টেক্সচার।
অন্য দিকে, ফ্রিজে রাখলে তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রিতে নেমে যায়, এই তাপমাত্রায় ঘি-এর বেশিরভাগ ফ্যাট এত দ্রুত এবং একই সাথে ক্রিস্টালাইজ হয়ে যায় যে বাছাই করে আলাদাভাবে দানা তৈরির কোনো সুযোগ থাকে না। ফলে ঘি দেখতে একটানা শক্ত মনে হয়, যেটা দানাদার ঘি নয়, শুধু ঘন জমাট বাঁধা।
তাই ঘি থেকে সেরা দানা পেতে হলে ফ্রিজ নয়, দরকার ধীর আর নিয়ন্ত্রিত ঠান্ডা। তাই জম্পেশ ঘি ডেলিভারি পাওয়ার পরে বোতলটা একবার ভালো করে ঝাকিয়ে নিন, যেন আগে থেকে জমে থাকা যেকোনো দানা সব কিছুর সাথে এভেনলি মিশে যায়। তারপর ঘরের ঠান্ডা জায়গায় (যেমন এসি রুমে) রেখে দিলে নতুন করে সুন্দরভাবে ক্রিস্টালাইজ হয়ে সমান দানাদার ঘি পাবেন আপনারা।

